ভূমিকাঃ

করোনা আক্রান্ত  সংকটাপন্ন রোগীদের থাকে প্রচন্ড কাশি, শ্বাসকষ্ট এবং গলাব্যথা, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এরা নিজে থেকে শ্বাস নিতে পারেনা। তখন তাদের ভেন্টিলেটরের মাধ্যমে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসের প্রয়োজন হয়। ভেন্টিলেটর রোগীর ফুসফুসে অক্সিজেন চালনা এবং কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণের কাজ করে। 

কিন্তু বাংলাদেশে ভেন্টিলেটরের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। দেশের এই ভেন্টিলেটর সংকট সমস্যার সমাধান করতে তৈরী করা হয়েছে দুর্বার কান্ডারী ইমার্জেন্সি ভেন্টিলেটর।

দুর্বার কান্ডারী  ইমার্জেন্সি ভেন্টিলেটর  যা অত্যন্ত কম খরচে  দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরী এবং যা পরিচালনা করাও অত্যন্ত সহজ এবং নিরাপদ। এই ভেন্টিলেটরটি বিশ্বের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় MIT কর্তৃক করোনাকালে প্রস্তুত কৃত  Emergency-Ventilator এর মডেল অনুসরণ করে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে প্রস্তুত করা হয়েছে । 

ভেন্টিলেটরের ফিচারসঃ

১. মোডঃ 

আমাদের ভেন্টিলেটরটি মূলত ভলিউম কন্ট্রোল মোড সাপোর্ট করে। এটি র‍্যাক অ্যান্ড পিনিয়ন এর মাধ্যমে যুক্ত দুটি ম্যাকানিক্যাল আর্মের সাহায্যে একটি অ্যাম্বু ব্যাগকে চাপ দেয়। এছাড়াও প্রেশার সেন্সরের সাহায্যে প্রেশারের মান এবং র‍্যাক এর ডিসপ্লেসমেন্ট হতে volume এর মান বুঝতে পারে এবং সেই অনুযায়ী মোড গুলোকে বাস্তবায়ন করতে পারে।

বর্তমানে আমাদের ভেন্টিলেটরে দুটি মোড বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। এগুলো হচ্ছে Assist Control Mode (AC)  এবং Manual Mode।

AC Mode: এই মোডে আমাদের ভেন্টিলেটর ব্যবহারকারীকে Tidal Volume, Frequency, FiO2 এবং  PEEP এর মান সেট করে দিতে হয়। পরবর্তিতে ভেন্টিলেটরটি রোগীকে  নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সিতে নির্দিষ্ট volume এর অক্সিজেন সমৃদ্ধ বাতাস সরবরাহ করবে। এক্ষেত্রে রোগী শ্বাস নেয়ার চেষ্টা করলে সম্পূর্ণ Breath Cycle সম্পন্ন হবে। যেসব রোগী দ্রুত নিশ্বাস প্রশ্বাস নেয় তাদের জন্য ACV অনুপযোগী।

Manual Mode : এই মোডে আমাদের ভেন্টিলেটর ব্যবহারকারীকে Tidal Volume, Frequency, I/E Ratio, FiO2, PEEP, Peak Pressure এর মান সেট করে দিতে হয়। এই মোডে ভেন্টিলেটরটি রোগীকে  নির্দিষ্ট I/E ratio অনুযায়ী নির্দিষ্ট  volume এর অক্সিজেন সমৃদ্ধ বাতাস সরবরাহ করবে। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সিতে সম্পূর্ণ Breath Cycle সম্পন্ন হবে। 

২. অ্যালার্মঃ

রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আমাদের ভেন্টিলেটরে রয়েছে  বিভিন্ন ধরণের অ্যালার্ম । এলার্ম সমূহ –  Exceeded PIP Pressure, Under Pressure,Tube leak, Unmet Tidal Volume, Over Current Fault এবং Mechanical Fault Alarm.

এখানে উল্লেখযোগ্য যে প্রতিটি অ্যালার্মই যেকোনো ক্রটি  বের করে তা ডিসপ্লেতে প্রদর্শন করবে।

রোগীর inspiratory pressure যদি কখনো নির্ধারণকৃত peak inspiratory pressure এর চেয়ে বেশি হয়, তাহলে ভেন্টিলেটরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যাম্বু ব্যাগ চাপ দেয়া বন্ধ করে দিবে এবং কর্তব্যরত ব্যক্তিকে একটি Exceeded PIP Pressure alarm এর মাধ্যমে বিষয়টির জানান দিবে। 

যদি কোনো কারণে Breathing Circuit বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তাহলে Tube Leak Alarm এর মাধ্যমে তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সতর্ক করে দিবে।

একইভাবে যদি কোনো লিকেজ বা অন্য কোনো কারণে inspiratory pressure এর মান তুলনামুলক কম হয়, তাহলেও ভেন্টিলেটরটি Under Pressure alarm এর মাধ্যমে তা কর্তব্যরত ব্যক্তিকে জানিয়ে দিবে।

আমাদের যন্ত্রটি  রোগীর  প্রয়োজনীয় Tidal Volume  অপেক্ষা কম  Tidal Volume সরবরাহ করলে   Unmet Tidal Volume alarm ব্যবহারকারীকে সতর্ক করবে।

যদি যন্ত্রটিতে নির্দিষ্ট সীমার অতিরিক্ত বিদ্যুত প্রবাহিত হয় ,তাহলে Over Current Fault Alarm এর মাধ্যমে তা ব্যবহারকারীকে সতর্ক করে দিবে। 

আমাদের যন্ত্রটিতে যে কোনো কারণে যান্ত্রিক ক্রটি দেখা  দিলে তা  Mechanical Fault Alarm. এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সতর্ক করে দিবে।

৩. অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপঃ

মোবাইল ফোনের ব্লুটুথকে সক্রিয় করে ভেন্টিলেটরের জন্য তৈরীকৃত অ্যাপটি চালু করলেই ভেন্টিলেটরের সাথে ব্যবহারকারীর মোবাইলের সংযোগ স্থাপিত হবে এবং ব্যবহারকারী তার মোবাইলের মাধ্যমে যন্ত্রটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। মোবাইল অ্যাপে গিয়ে ব্যবহারকারী নিজের প্রয়োজনমত BPM, Tidal Volume ,PEEP ইত্যাদির মান সেট করতে পারবেন। মান সেট করা সম্পন্ন হলে যন্ত্রটি  একটি কনফার্মেশন মেসেজ ব্যবহারকারীকে পাঠাবে এবং যন্ত্রটির “1” বাটন ও “স্টার্ট” বাটন প্রেস করার সাথে সাথে যন্ত্রটি নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করা শুরু করবে। ফোনের অ্যাপের মাধ্যমে ব্যবহারকারী রোগীর প্রেশার ফ্লো এর গ্রাফও দেখতে পারবেন। 

৪. ওয়েব অ্যাপঃ

একসাথে অনেক রোগীকে পর্যবেক্ষণে রাখার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে ওয়েব অ্যাপ  দ্বারা কয়েকটি ভেন্টিলেটরের একত্রে তথ্য প্রাপ্তি এবং পর্যবেক্ষণ  করবার ব্যবস্থা । এক্ষেত্রে চিকিৎসক  ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভেন্টিলেটরের  সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পারবেন এবং ভেন্টিলেটরকে পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। ওয়েব অ্যাপের মাধ্যমে চিকিৎসক একের অধিক ভেন্টিলেটর একসাথে পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। এই ফিচারটিকে উন্নত করবার জন্য কাজ চলছে।  এই ওয়েব অ্যাপের মাধ্যমে দেশের  যেকোনো প্রান্ত থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রোগীকে দেখাশোনা করতে পারবেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে পারবেন। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীরা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের অধীনে চিকিৎসা লাভের সুবিধা পাবেন।  এছাড়াও ওয়েব অ্যাপের একটি নির্দিষ্ট ডাটাবেজ থাকবে , যে ডাটাবেজে রোগীর পূর্বের তথ্যাবলীসহ সমস্ত তথ্য জমা থাকবে যার ফলে চিকিৎসকের পক্ষে রোগীর অবস্থা বুঝে চিকিৎসা দেয়া সহজ হবে। চিকিৎসক রোগীর অবস্থা অনুযায়ী ফোনে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা পাঠাতে পারবেন এবং ভেন্টিলেটর চালনাকারী সেই নির্দেশনা অনুযায়ী ভেন্টিলেটরটি পরিচালনা করবেন।

এই ভেন্টিলেটরটি  মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকায় প্রস্তুত করা সম্ভব  কেননা দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে এবং কেবল করোনা আক্রান্ত রোগীদের  চাহিদার কথা ভেবে এই ভেন্টিলেটর প্রস্তুত করা হয়েছে। করোনা মহামারী এবং লকডাউনের সময়ে গঠিত হওয়া টিম দুর্বার কান্ডারী রুয়েট এই ভেন্টিলেটরটি প্রস্তুত করেছে।  এর সাথে যুক্ত  রুয়েটের শিক্ষার্থীগণ  দেশের বিভিন্ন প্রান্ত হতে ইন্টারনেটের মাধ্যমে একত্র হয়ে এই ভেন্টিলেটরের কাজ সম্পন্ন করেছেন এবং এই ভেন্টিলেটরটিকে আরোও উন্নত করার জন্য  তারা দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন ।

দুর্বার কান্ডারী ইমার্জেন্সি ভেন্টিলেটরের মাধ্যমে বাংলাদেশের ভেন্টিলেটর  সংকট  সমস্যার সমাধান হবে-  এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

en_USEN
bn_BDBN en_USEN

Pin It on Pinterest

Share This